বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০২:৫৮ অপরাহ্ন

নোটিশ :
বাউফল নিউজ ওয়েবসাইটে আপনাদের স্বাগতম

রত্নাবতী

দিদার মুহাম্মদ:এক হতদরিদ্র কৃষকের ‘রত্নাবতী’ নামে এক কন্যা ছিল। সে ছিল অপূর্ব সুন্দরী। রাজ্যের অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন লোক তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। কিন্তু রত্নাবতী যেমনি ছিল সুন্দরী তেমনি ছিল বু্দ্ধিমতী। তার বাড়ির পেছনে ছিল পঁচিশ হাত লম্বা এক পুকুর। সে শর্ত দিল যে ব্যক্তি তার এই পুকুরটি অর্থ-সম্পদ দিয়ে পরিপূর্ণ করতে পারবে সে-ই কেবল তাকে বিয়ে করতে পারবে। এই শর্ত শুনে সব লোক পিছু হটলো। তাকে বিয়ে করে কি তারা পথে বসে ভিখ মাঙবে নাকি? সমস্ত সম্পত্তি বিসর্জন দিয়ে তারা কেবল একটা সুন্দরী বৌ দিয়ে কী করবে?

ঐ গ্রামে নওয়াব নামে ছিল এক বণিকপুত্র। তার বাবা-মা কেউ ছিল না। রত্নাবতীকে দেখে সে সব কিছু যেন বেমালুম ভুলে গেল। সে তার সমস্ত অর্থ-কড়ি আর গয়নাগাটি যা ছিল সব ঢেলে দিল পুকুরের মধ্যে। কিন্তু এতে পুকুর পূর্ণ হলো না। সে তার দালান-বাড়ি আর জায়গা জমি বেচে দিল। আর পুকুর পূর্ণ করল। তারপর সে রত্নাবতীকে বিয়ে করে সুখেই ‍দিন কাটাতে লাগলো।

নওয়াব ছিল বণিক। তার ছিল বিলাসবহুল জীবন। কিন্তু সে রত্নাবতীর জন্য সব ত্যাগ করে এক কুঁড়েঘরে থাকতে লাগলো। মেঝেতে শুয়ে সে তার সমস্ত দুঃখ ভুলে যেত কেবল রত্নাবতীর অনিন্দ্য সুন্দর মুখখানি দেখে।

রত্নাবতী ছিল খুবই বুদ্ধিমতী। সে কেবল নওয়াবকে পরীক্ষা করছিল। কিন্তু সে তার স্বামীর দুঃখ আর সহ্য করতে পারছিল না। সে বাজার থেকে খুব ভাল একটি কাপড় কিনে তা সেলাই করে একটা পোশাক বানালো। নওয়াবকে বলল বাজারে নিয়ে পাঁচশত রূপিতে বিক্রি করতে। নওয়াব পোশাকটা হাতে করে সারারাজ্য ঘুরলো কিন্তু কেউ কিনলো না। যে-ই কেউ পছন্দ করে পাঁচশত রূপি শুনে পিছিয়ে যায়।

শেষমেষ সে পোশাকটি নিয়ে রাজদরবারে পৌঁছল। রাজা পোশাকের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়। রাজা নিজেই সেটা পড়ে দেখে। তারপর নওয়াবকে জিজ্ঞেস করে, ‘সত্যি করে বলতো এই পোশাক তুমি কোথায় পেলে?’ নওয়াব জবাব দেয়, ‘মহারাজা, আমার স্ত্রী রত্নাবতী এই পোশাক বানিয়েছে। আর আমাকে বিক্রি করতে দিয়েছে। এর দাম পড়বে ‍ঠিক পাঁচশত রূপি।’

রাজা রত্নাবতীর রূপ সম্পর্কে জানত। সে কেবল পোশাক দেখেই সন্তুষ্ট হতে পারলো না। সে সঙ্গে সঙ্গে নওয়াবকে কারাবন্দি করল। বাগানের মালিনীকে বলল, ‘যাও, রত্নাবতীকে নিয়ে আসো। আদ্য সূর্যাস্তের পূর্বে তাকে আমার প্রাসাদে না আনতে পারো তো তোমার মুখে চুনকালি মেখে রাজ্য থেকে বের করে দেব।’ মালিনী সময়মত রত্নাবতীর বাড়ি এসে হাজির হল পাল্কি আর বেহারা সমেত। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, ‘মা রত্নাবতী! তোমার স্বামী পোশাক বেচতে আজ রাজদরবারে গিয়েছিল। কিন্তু কপালের কী ফের দেখ! রাজার এক হাতি লাগামহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কারণ গত আটদিন ধরে হাতিটা পাগল হয়ে গেছে। সে তোমার স্বামীকে শুরে তুলে আছাড় মেরেছে। শুধু তাই না, সে তাকে পায়ের নিচে পিশে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তোমার স্বামী রক্তে যেন ভেসে যাচ্ছে। সে এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। মরার আগে তোমার স্বামী তোমাকে যে এক নজর দেখতে চাইছে, মা। জলদি চল, রাজা এই পাল্কি পাঠিয়েছেন তোমাকে নেবার জন্য।’ রত্নাবতী বুঝতে পারে না সে কি করবে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে মালিনীর সাথে পাল্কিতে উঠে বসে। পাল্কি রাজতোরণে এসে থামে। রাজা অপেক্ষায় ছিল। আসা মাত্রই রাজা একটি কক্ষে রত্নাবতীকে বন্দি করে। এবার রত্নাবতী তার ভুল বুঝতে পারে। সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তার নিজের বোকামির জন্য তাকে বাড়ি ছেড়ে এখানে বন্দি হতে হলো। সে এখন কী করবে?

রাজা নওয়াবকে পাঁচশত রূপি দিয়ে বিদায় করে দিল। নওয়াব বাড়ি ফিরে দেখল রত্নাবতী ঘরে নেই। সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। চিৎকার করতে লাগল, ‘ও রত্নাবতী! তুমি আমায় ছেড়ে কোথায় চলে গেলে?’ সে সব জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজেও রত্নাবতীকে আর পেল না।

এদিকে রাজা রত্নাবতীকে বিয়ের জন্য তোড়জোড় করতে লাগলো। রত্নাবতীও দেখলো মেনে নেয়া ছাড়া কোন পথই খোলা নেই। রাজাকে থামানো যাবে না। রত্নাবতী কী বলে? ‘প্রিয়রাজা! যদি এই বাদীকে আপনার প্রাসাদে একটু ঠাঁই দেন তো আমার এরচে’ বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে। আমি এক কুঁড়ে ঘরে ছিলাম। এখন যে আমি প্রাসাদে থাকব। স্বয়ং মহারাজা হবেন আমার স্বামী! আমাকে আর ঐ ভিখেরী স্বামীর সাথে সারাজীবন কাটাতে হবে না! কিন্তু প্রিয়রাজা! আমার যে একটা ব্রত আছে! আমি যে চার মাস অবধি কোন পুরুষের ছায়াও দেখতে পারব না। আমি প্রতি সকালে গরিব মানুষের মাঝে কিছু দান করব। আর শিবের কাছে প্রার্থনা করব। আমায় কিছু অর্থকড়ি দিন আর আমার জন্য একটি পৃথক বাড়ি বানিয়ে দিন। ঠিক চার মাস পর আমি আপনার রাণী হব।’ রাজ এতো সুন্দর কথা শুনে মুগ্ধ হল। সে কিছুই আন্দাজ করতে পারল না তার সাথে কী খেলা খেলতে যাচ্ছে রত্নাবতী। সে রত্নাবতীর জন্য গ্রামের ঐ মাথায় এক বাড়ি বানিয়ে দিল। পর্যাপ্ত চাকর-বাকর আর অর্থকড়ি দেওয়া হল। প্রহরীও দেওয়া হল তার নিরাপত্তার জন্য। রত্নাবতীও তার পরিকল্পনা তৈরি করল। সে এক চাকরকে হাত করে নওয়াবকে ঐ রাতে তার ঘরে আসার কথা জানালো। তার পরিকল্পনা ছিল তারা ঘোড়া ছুটিয়ে এই রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যাবে।

এক প্রহরী এই পরিকল্পনার কথা জানে ফেলে। সে যেখানে ঘোড়া দুটি প্রস্তুত করা ছিল সেখানে লুকিয়ে থাকলো। রত্নাবতী একটি ঘোড়ায় উঠে অন্যটিতে নওয়াবকে ওঠার ইঙ্গিত করে তার ঘোড়া ছুটালো। যখন নওয়াব তার ঘোড়ায় উঠতে যাবে তখন প্রহরী তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে নিজে চড়ে বসল ঘোড়ায়। রত্নাবতী জোরে ঘোড়া ছুটাল, সে ছুটতে থাকল রত্নাবতীর পেছন পেছন। যখন ভোর সমাগত, তখন তারা অন্য এক রাজ্যে এসে পৌঁছল। রত্নাবতী এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পেছনে তাকাতেই আকাশ থেকে পড়ল। এ তো নওয়াব নয়! তার প্রহরী যে তার পিছু নিয়েছে! সে যেন গরম তেলের কড়াইয়ে ঝাঁপ দিয়েছে। সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। সে প্রহরীকে বললো, ‘আমি নিতান্ত এক মেয়ে মানুষ। এই অচেনা জায়গায় আমি তো কিছুই করতে পারবো না। এখানে আমরা আমাদের ভাগ্যান্বেষণ করবো, গৃহ নির্মাণ করব।’ তারা ঘোড়ায় চড়ে এদিক সেদিক ঘুরতে থাকলো। এটি ছিল এক নির্জন এলাকা, কোন বসতিই চোখে পড়ল না। রত্নাবতী বলল, ‘আমি ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছি। আশেপাশে কোন ঘরবাড়িও দেখছি না। এই গাছ বেয়ে উপরে উঠে দেখ আশেপাশে কিছু দেখা যায় কি না।’ খুব কষ্টে প্রহরী গাছ বেয়ে উপরে উঠল। রত্নাবতী লক্ষ করল প্রহরীর পায়ে কোন সমস্যা আছে। সে নিশ্চয়ই খোঁড়া। রত্নাবতী তার কোষ থেকে তরবারিটি বের করে প্রহরীর ঘোড়াটা মেরে ফেলে ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল। প্রহরী গাছের উপর থেকে বেকুবের মতো সব দেখতে থাকল।

এক রাজ্যের রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্র ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা শিকারে বের হয়েছিল। তারা দেখল অপূর্ব সুন্দরী এক রমণী ঘোড়ায় ছুটছে। তারা তাকে থামাল। মন্ত্রীপুত্র প্রথম রত্নাবতীর ঘোড়ার লাগাম ধরল। রাজপুত্র বলল, ‘বন্ধু, এই রমণী একমাত্র আমারই উপযুক্ত।’ মন্ত্রীপুত্র বলল, ‘তা কী করে হয়! আমিই প্রথম তার ঘোড়ার লাগাম করগত করেছি। সে আমার।’ তারা তর্ক করতে লাগল। মধ্যস্থতা করল রত্নাবতী। বলল, ‘শোন, আমি জাম্বুদেশের রাজকন্যা। আমি আমার রাজ্যে নিজের জন্য উপযুক্ত কোন বর পাইনি বলে উপযুক্ত কারও জন্য বের হয়েছি। আর ভাগ্যক্রমে তোমাদের সাথেই দেখা। বেশ ভাল হল। তোমরা দুজনই বেশ সুপুরুষ। কিন্তু কাকে আমি বাছাই করব? হুম, আমার ফুলের মালা তো তাকেই পড়ব, ‍তোমাদের মধ্যে যে বেশি বুদ্ধিমান। আমি আমার এই হীরের আংটিটি কুয়োর পানিতে ফেলব, তোমাদের মধ্যে যে এটা উদ্ধার করে আমার কাছে আসতে পারবে তাকেই আমি বিয়ে করব।’

রত্নাবতী হাতের আংটি খুলে কুয়োতে ফেলে দিল। রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্র কাপড় খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল কুয়োয়। রত্নাবতী তাদের ঘোড়া দুটোকে হত্যা করল। মন্ত্রীপুত্রের পোশাক পুড়িয়ে ফেলল আর রাজপুত্রের পোশাক পড়ে ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল। রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্র যখন কুয়ো থেকে উঠল দেখল রত্নাবতী আর তাদের পোশাক নেই, ঘোড়া দুটোও শেষ। তারা লজ্জায় একে অন্যের ‍দিকে তাকাতে পারলো না।

রত্নাবতী অন্য একটি রাজ্যে এসে পৌঁছল। সে ছিল খুব ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত। সে ঘোড়াটা বেঁধে একটা পুকুর থেকে পানি পান করল। গাছের ছায়ায় বসে সে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে শক্তি সঞ্চার করল। সে তো বুদ্ধি-গুণে কতগুলো ফাঁদ থেকে বেঁচে গেছে। সে ভাবল অনাগত দিনে না জানি তার কপাল কী রেখেছে ঈশ্বর!

সে এমন একটি রাজ্যে এল যে রাজ্যের রাজা কোন উত্তরাধীকারী না রেখেই অক্কা পেয়েছে। কে হবে পরবর্তী রাজা? রাজার হাতি তার শুরে পানির পাত্র নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে। উদ্দেশ্য পরবর্তী রাজার অনুসন্ধান। সে যে ব্যক্তির মাথার উপর পানি ঢেলে দিবে সেই হবে পূর্ব ঘোষিত আকাঙ্ক্ষিত পরবর্তী রাজা। শেষমেষ হাতিটি কী করল, রত্নাবতীর সামনে এসে তার মাথায় দিল পানি ঢেলে। শত শত মানুষের মধ্যে হৈ-হুল্লড়, চিৎকার-চেঁচামেচি বেঁধে গেল যেন আনন্দের বাঁধ ভেঙে গেল। তারা তাদের নতুন রাজাকে মাথায় করে রাজ্যে নিয়ে গেল। কেউ তো আর রত্নাবতীর আসল খবর জানতো না। সে রাজা হয়ে রাজ্য পরিচালনা আরম্ভ করল।

যে রাজা তার রাজ্যে রত্নাবতীকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সে অনবরত রত্নাবতীর চিন্তায় খাওয়া-দাওয়া আর রাজ্য পরিচালনা প্রায় ছেড়ে দিল। সভাসদ বিরক্ত হয়ে তার মসনদ থেকে সরিয়ে পরিবর্তে অন্য কোন কাউকে রাজা বানানোর চিন্তা করল। সভাসদ শেষমেষ তাকে মসনদচ্যুত করেই ছাড়ল। তারা অন্য কাউকে তাদের রাজা মনোনীত করল। রাজা সব ছেড়ে রত্নাবতীর খোঁজে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। এদিকে নওয়াবও পাগলের মত ঘুরে বেরাচ্ছিল। হঠাৎ তাদের মধ্যে দেখা হয়ে গেল। সে রাজার সহচর ও বন্ধুতে পরিণত হল। চলতে চলতে তারা সেই খোঁড়া প্রহরীর দেখা পেল। খোঁড়া প্রহরী সব খুলে বলল আর তাদের সঙ্গে রত্নাবতীর খোঁজে যেতে চাইল। তারা এবার তিন বন্ধু হল। তিনজন চলতে চলতে দেখা পেল সেই রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্রের। তারও তাদের সাথে যুক্ত হতে চাইল। এভাবে পাঁচজনই বন্ধু হয়ে গেল। চলতে চলতে শেষে তার সেই রাজ্যে পৌঁছল যে রাজ্যে রত্নাবতী রাজা।

রত্নাবতী এদিকে তার গুপ্তচরকে নির্দেশনা দিল রাজ্য সীমার মধ্যে বিদেশি বা বহিরাগত যে কাউকে পাবে সঙ্গে সঙ্গে ধরে রাজদরবারে হাজির করতে। গুপ্তচর এই পাঁচজনকে ধরে দরবারে নিয়ে আসল। রত্নাবতী লুকিয়ে এই পাঁচজনকে দেখে নেয়। তার কাউকে চিনতে মোটেই কষ্ট হয় না।

রত্নাবতী তার একটা ছবি তৈরি করে প্রাসাদের তোরণে স্থাপন করার নির্দেশ দিল। আর গুপ্তচরকে বলল পাঁচজনকে সেই ছবির সামনে নিয়ে যেতে। সে নিজেও সেখানে গেল তবে নিজেকে প্রকাশ না করে। সে দেখতে চাইল এই পাঁচজনের কী অভিব্যক্তি। পাঁচজন ছবিটি দেখামাত্র একে অন্যের মুখ চেয়ে বলল, ‘কেমন করে এই ছবি এখানে এল?’ ছবির প্রহরায় থাকা প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল ইনিই তাদের নতুন রাজা।

রাজা এবার ছবির দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, ‘কী চতুর তুমি! আমার প্রহরীদের ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছ! আমার মুখে চুনকালি পড়েছে তোমার জন্য। আর এখন তোমার খোঁজে আমি এমন রাজ্যে এলাম যেখানে তুমিই রাজা! আমার হাতকড়া খুলে দাও! আমি যদি ছাড়া পাই তোমাকে কেটে টুকরো-টুকরো করে ফেলব। আর তোমার রক্তে আমি তিলক পড়ব। যদি তাতেই আমার একটু শান্তি হয়!’

খোঁড়া প্রহরী বলল, ‘তুমি আমায় গাছে তুলে পালিয়ে গেছ! যদি আমার সামনে তোমায় পাই তবে তোমার মাথায় এক লাথি চড়াব।’

রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্র বলল, ‘তুমি আমাদের একে অন্যকে বোকা বানিয়েছ, পরস্পরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছ। আমরা আমাদের ঘোড়া আর পোশাক হারিয়েছি। কিভাবে আমরা আমাদের রাজ্যে ফিরে যাব? জান আমরা রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্র? কিন্তু এখন আমরা ভিখেরীর মত ঘুরে বেরাচ্ছি! তোমাকে আমরা হাতে পেলে তোমার নাক-কান কেটে মুখে চুনকালি মেখে ছেড়ে দিতাম!’

নওয়াবের চোখ থেকে তখন ছলছল করে পানির ঝর্ণা গড়িয়ে পড়ছিল। সে বলল, ‘না, না, না! আমি তো তোমার মত স্ত্রী আর পাব না! তোমার সাথে কি আর এই জীবনে আমার মিলন হবে? তোমায় না পেলে আমি আমার জীবন ভাগিরথী-গঙ্গায় কাটিয়ে দেব।’ সে ছবিটি জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

রত্নাবতী দাসকে হুকুম দিল, ‘লোকগুলোকে দেখে চোর-ডাকাত মনে হচ্ছে। তাদের ধরে আমার সামনে হাজির কর।’ তাদের ধরে রত্নাবতীর সামনে হাজির করা হল। রত্নাবতী রাজার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে জল্লাদকে বলল, ‘একে কেটে টুকরো-টুকরো করে ফেল আর আমার জন্য ওর রক্ত নিয়ে আসো। আমি ঐ রক্তে তিলক পড়ব।’

খোঁড়া প্রহরীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে দাসকে বলল, ‘ওর মাথায় লাথি মারতে থাকো যতক্ষণ না ওর মাথা ফেটে যায়।’

আরেক দাসকে বলল, ‘ঐ রাজপুত্র আর মন্ত্রীপুত্রের মাথা অর্ধেক ন্যাড়া করে মুখে চুনকালি মেখে রাজ্যের বাইরে বের করে দাও।’

রত্নাবতী সবার পাওনাই বুঝিয়ে দিল। বাকি রইল নওয়াব। সে নওয়াবকে তার প্রাসাদের ভেতরে ডাকল। আদেশ মত তারা তার শরীরে তেল মেখে গোসল দিল। তার গায়ে জড়াল রেশমের পোশাক। কপালে চন্দনকাঠের তিলক। আর গলায় পড়াল ফুলের মালা। নওয়াব এসবের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। নওয়াবের জন্য কিছুমাত্র অপ্রস্তুত হয়ে পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু সে পুরোমাত্রায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে ভাবল হয়ত তার জীবনের শেষ মুহূর্ত সমাগত। তারা তাকে নিশ্চিত ঈশ্বরের সামনে বলি দেবার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

মানুষ মরার আগে ঈশ্বরের নাম জপে। নওয়াব জপছিল কেবল রত্নাবতীর নাম। ‘রত্নাবতী! মরার আগে আমি তোমাকে যে একটিবার দেখতে পেলাম না। জানলাম না তুমি কেন আমাকে ছেড়ে গেলে।’ ঠিক এই মুহূর্তে রত্নাবতী তার সামনে এসে তার পাযের কাছে লুটিয়ে পড়ল।

রত্নাবতীকে সুসজ্জিত পোশাক আর অলঙ্কারে মনে হচ্ছিল স্বর্গীয় সুন্দরী। সে নওয়াবকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘আমার জন্য তোমাকে কত কষ্টই না সইতে হয়েছে!’ সে তার মাথা থেকে রাজমুকুট খুলে নওয়াবের মাথায় পড়িয়ে দিল। নওয়াব হল রাজা। তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকল।

এমএ/ ০৭:৩৬/ ১০ আগস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2018 Bauphalnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com