শুক্রবার, ২০ Jul ২০১৮, ০২:৩০ অপরাহ্ন

নোটিশ :
বাউফল নিউজ ওয়েবসাইটে আপনাদের স্বাগতম
তলস্তয়ের দেশে বলশেভিক বিপ্লব

তলস্তয়ের দেশে বলশেভিক বিপ্লব

যশোরের কালীগঞ্জ বাজার থেকে কোটচাঁদপুর যাওয়ার প্রধান সড়ক। সড়কের দুধার ঘেঁষে রয়েছে সারি সারি বৃক্ষ। সারা বছর তারই ছায়ায় আধো আলো আধো অন্ধকার পরিবেশ বিরাজ করে। প্রচণ্ড রোদে পথচারীদের স্বস্তি দেয় এই বনাশ্রিত পরিসরটুকু। সাত কিলোমিটার যাওয়ার পর ডান হাতে পড়বে এলাঙ্গি নামের একটি গ্রাম। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমি এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বয়সে তখন তরুণ। সে কারণে সমস্যা ছিল দুদিক থেকে। মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার ইচ্ছা অনেকবার ব্যক্ত করেছি। কিন্তু বাবার বাধায় সেটি হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রোশে পড়ারও শঙ্কা ছিল। বাবা-মা চেয়েছিলেন সেই শঙ্কাবোধ থেকে আমাকে মুক্ত রাখতে। মনে আছে, তখনো ঘোর অন্ধকার। সূর্য ওঠার অনেক বাকি। মা একটি ব্যাগে কিছু খাবার এবং কাপড়চোপড় সযত্নে গুছিয়ে দিয়ে আমাকে বললেন, ‘যুদ্ধের কারণে তোকে এলাঙ্গি যেতে হবে। যুদ্ধ চলছে। সেখানেই থাকবে।’ জায়গাটিকে নিরাপদ ভেবে সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন বাবা। যুদ্ধের কারণে আমাদের পরিবার তখন গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। বাস-ট্রেনে করে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমি এবং আমার বাবা রওনা হলাম হেঁটে। ২৫ কিলোমিটার পথ। তখনো চারদিক ঘোর অন্ধকার। হেঁটে চলেছি গ্রামের ধূলিময় রাস্তা দিয়ে। মাঝেমধ্যে উন্মুক্ত মাঠ, জলে ভরা খাল-বিল। কৃষকের বাড়ির উঠানের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে আমার ক্লান্ত দুখানি পা। রাস্তার পাশে পোড়াবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। জিজ্ঞাসা করি ‘কারা পোড়াল?’ উত্তর এল, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গতকাল এসেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে।’ অতি সন্তর্পণে পাকিস্তানি সেনাদের দৃষ্টি এড়িয়ে কোথাও সোজা পথ, কোথাও আঁকাবাঁকা পথ ধরে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে অবশেষে পৌঁছালাম এলাঙ্গি গ্রামে। এই গ্রাম বাবার মায়ের জন্মস্থান।

বাবার বয়স যখন দশ তখন আমার দাদি এবং দাদা দুজনেই মারা গিয়েছিলেন। দাদির মৃত্যুটি ছিল আকস্মিক। ব্যাসিলারি আমাশয় নামের এক রোগে তিনি গত হয়েছিলেন দুই দিনের ব্যবধানে। সে সময় ওই রোগের কোনো ঔষধি প্রতিকার ছিল না। ফলে মারা গিয়েছিলেন যাকে বলে বিনা চিকিত্সায়। এ নিয়ে বাবার মনে দুঃখের সীমা ছিল না। মাঝেমধ্যে আমাদের সঙ্গে যখন তিনি মায়ের গল্প বলতেন তখন দেখতাম তাঁর চোখ দুটো ছলছল করছে। বাবার নানিমাকে আমি দেখেছি অনেকবার। তিনি দীর্ঘায়ু পেয়েছিলেন। একেবারে একচিলতে শরীর। বয়স নব্বই-পঁচানব্বই হবে। মুখের মাংস ঝুলে পড়ছে। চোখের দৃষ্টি নিথর। ধবধবে সাদা শাড়ি পরে পরিসর সীমিত একটি ঘরে তাঁর আশ্রয়। সারা দিন কাটিয়ে দিতেন বিছানার ওপর বসে। দুই পা একসঙ্গে করে হাত দুটো দুই হাঁটুর ওপর রেখে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতেন। মাঝেমধ্যে মন্ত্র পড়ার মতো বিড়বিড় করতেন। নিজের সঙ্গেই যেন কথা বলছেন। কখনো মনে হতো যেন কোনো গভীর ধ্যানে মগ্ন। সেই মগ্নতা ভেঙে যেত ক্ষণিকে যখন কারও পায়ের শব্দ পেতেন। মাঝেমধ্যে দেখেছি শুয়ে আছেন। শোয়া বলে না। মায়ের গর্ভে শিশু যেভাবে মাথা এবং পা এক বিন্দুতে এনে শরীরটাকে ধনুকের মতো বেঁকিয়ে রাখে, ঠিক সেই রকম। ভাবি জন্ম আর মৃত্যুর মধ্যে কতই বা পার্থক্য! সন্দেহ বোধ করি প্রৌঢ়ত্ব আর শিশুকালের মধ্যে ব্যবধান বলে কিছু আছে কি না। মাঝেমধ্যে তাঁর পাশে গিয়ে আমি বসেছি। বসে থেকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করেছি তাঁর সান্নিধ্য। আমার সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেন কী আদর করে! ভেবেছি আমার দাদি মেহেরুন্নেছাকে আমি দেখিনি বটে। কিন্তু যিনি তাঁর গর্ভধারিণী তাঁর পাশেই তো বসে আছি আমি। যেন অনুভব করছি মেহেরুন্নেছার স্পর্শ। কেমন ছিলেন তিনি জানি না। তাঁর কোনো ছবিও নেই আমাদের পারিবারিক সংগ্রহে। কিন্তু বাবা বলতেন তাঁর গায়ের রং ছিল এমনই ফরসা যে নীল রঙের শিরা-উপশিরাগুলো দেখা যেত সুস্পষ্টভাবে। বংশ মানসম্মান রক্তের যে ধারা এই বৃদ্ধার দেহে প্রবাহিত তার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততার কথা ভেবে মন এক আবেগের স্রোতে ভেসে যেত। ভাবলেশহীনভাবে তাঁর পাশে বসে আমি কাটাতাম দীর্ঘ মুহূর্ত।

এই নারীর স্নেহেই বড় হয়েছিলেন আমার বাবা। কিন্তু তারপরও কঠোর অনাথ জীবন তাঁর মনের সব উষ্ণতা এবং জীবনের স্বাভাবিক প্রবণতাগুলো ধ্বংস করে দিয়েছিল অনেকটা অলক্ষ্যে। সেই নির্দয় মনোজগত্ তাঁর ব্যবহারিক জীবনে প্রতিফলিত হতে দেখেছি। আলাপ ব্যবহারে দেখেছি রুক্ষতার ছাপ। রাগী ছিলেন প্রবলভাবে। ছেলেমেয়েদের রাখতেন কঠোর শাসনের বাঁধনে। জীবনে অতিমাত্রিক উচ্ছলতা কখনো পছন্দ করতেন না। মায়ের প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা। সেটি জেনেছি তাঁর লেখা ডায়েরির পাতায়। কিন্তু ভালোবাসার সেই অনুভূতি প্রায়ই ভোঁতা হয়ে তার জায়গায় স্থান করে নিত নির্মম কঠোরতা। যদি সততার কথা বলি তাহলে সেখানে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। কোটচাঁদপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করে তিনি পড়তে গিয়েছিলেন কলকাতার রিপন কলেজে। এই এলাঙ্গি গ্রামে ছোটবেলায় আমি এসেছি বহুবার। মানুষের মুখে শুনেছি বাবার ছোটবেলার নানা কাহিনি। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে যে কটি মাস এখানে কাটিয়েছি, সে সময়কে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় বলে মনে করি। আজও মনে পড়ে বাবার মামাতো ভাইয়ের স্নেহ ও আদর। এ যেন আত্মার টান। সেই টান আমাকে বহুবার বহু কারণে নিয়ে এসেছে এলাঙ্গি গ্রামের অতি কাছের কিছু মানুষের সান্নিধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের তীব্রতা এখানেও কমবেশি উপলব্ধি করেছি। লক্ষ করেছি গ্রামের আশপাশে মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে সক্রিয় আছে। তাদের সাহায্য করতে সচেষ্ট হয়েছি। একবার এখানে আশ্রয় নেওয়া এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে (তাঁর নাম দুলাল) গিয়েছিলাম ট্রেনলাইন উপড়ে ফেলতে। হাতে লোহার রড। সঙ্গে একটি রেঞ্জ। সেই রেঞ্জ দিয়ে খুলতে চেষ্টা করেছিলাম ট্রেনলাইনের নাটবল্টু। পারিনি। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি। সময়টি আমার জন্য ছিল আশা-নিরাশার মধ্যে বাস করা। রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর শুনে ভরসায় বুক বেঁধেছি। আবার সব আশা-ভরসা ভেসে গেছে মুক্তিযুদ্ধের কোনো দুঃসংবাদ, ব্যর্থতা অথবা বিশেষ কোনো মৃত্যুসংবাদে। দাদার বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের টহল ছিল প্রায় প্রতিনিয়ত। সামরিক গাড়ির কনভয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ধীরগতিতে এগিয়ে যেত কোটচাঁদপুরের দিকে। আবার ফিরে যেত যশোর ক্যান্টনমেন্টে। বাড়ির জানালা দিয়ে আড়চোখে তাদের চেহারা দেখেছি। জিপ গাড়ি থামিয়ে মাঝেমধ্যে তারা রাস্তার দুপাশে হেঁটে চলা মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করত। দু-একজনকে তুলে নিত জিপে। উত্তেজনা ভীতি আশঙ্কা—সব মিলিয়ে কেটে গেছে ওই কয়েক মাস। একদিন দেখি বাবার সর্বকনিষ্ঠ মামাতো ভাই উধাও। কেউ জানে না কোথায় হাওয়া হয়ে গেলেন তিনি। পরে জানা গেল পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে তাদের ক্যাম্পে। এলাঙ্গি গ্রামে এ ধরনের ঘটনা তেমন ঘটতে শুনিনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ যতই সমাপ্তির দিকে এগিয়ে গেছে, পাকিস্তানি সেনারা ততই হয়ে উঠেছে মরিয়া।

১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর। দিনটির কথা ঠিক মনে আছে। দুপুরে হঠাত্ রটে গেল পাকিস্তানি সেনারা কালীগঞ্জ বাজার থেকে অগ্রসর হচ্ছে কোটচাঁদপুরের দিকে। আমরা পালাচ্ছি। মাঠ অতিক্রম করে যাচ্ছি পাশের গ্রাম গুড়পাড়ায়। মাঠ পার হতে গিয়ে পড়লাম বিপদে। পাকিস্তানি মর্টার আক্রমণ চলছে মাঝেমধ্যে। মনে হচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে উড়ছে মর্টার। তার বিকট শব্দ আকাশ-বাতাসকে প্রকম্পিত করছে। মাটিতে শুয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করলাম। ওপরে নীল আকাশ। চারদিকে শীতের শস্যহীন খালি মাঠ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পুনরায় প্রাণ নিয়ে পালানোর চেষ্টা। আমার সঙ্গে ছিল আমার দুই বোন এবং বাবা। রাত কাটল প্রায় না ঘুমিয়ে। প্রচণ্ড গোলাগুলি চলল রাতভর। ঘুম আসে না। উঠানে সবাই জড়ো হয়ে বসে আছি। বাবা ভয়ে সন্ত্রস্ত। কী হবে দুই যুবতী মেয়েকে নিয়ে। যদি পাকিস্তানি সেনারা এই গ্রাম আক্রমণ করে? কী হবে আমার মতো যুবককে নিয়ে। জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভাবি নানা কথা। ভোরের দিকে গোলাগুলি থেমে এল। সকালে উঠে দাদার বাড়ির দিকে এগোচ্ছি। পুকুরের ধারে পৌঁছে দেখি এক ভারতীয় শিখ সেনার মৃতদেহ গোলার আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া নারকেলগাছের একেবারে গোড়ায় শায়িত অবস্থায় আছে। দেহে প্রাণ নেই। বুকের জায়গাটিতে চাপ চাপ রক্ত। পা নেই। হাতে তখনো বন্দুকটি ধরা। ভাবি কোথায় কোন সুদূর পাঞ্জাব থেকে আসা এই তরুণ সেনা। দেহটি পড়ে আছে এই গ্রামের মাটিতে। বাবা-মা, পরিবার-পরিজন আত্মীয়স্বজন জানল না বাংলার প্রত্যন্ত এই গ্রামে চিরশায়িত আছে তাদের সন্তান, ভাই, স্বামী বা আর কেউ। বাংলার মাটিকে মুক্ত করতে গিয়ে জীবন দিল অকৃপণভাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2018 Bauphalnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com