সোমবার, ২০ অগাস্ট ২০১৮, ১১:২২ অপরাহ্ন

নোটিশ :
বাউফল নিউজ ওয়েবসাইটে আপনাদের স্বাগতম
ভুল চিকিৎসার শাস্তি

ভুল চিকিৎসার শাস্তি

দেশজুড়ে ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তারের দৌরাত্ম্য বাড়ছে দিন দিন। বিভিন্ন ডিগ্রি সংবলিত সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে নিরীহ রোগীদের প্রতারিত করছেন তারা। হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। ফলে চিকিৎসাসেবায় সৃষ্টি হচ্ছে ভীতিকর পরিস্থিতি। ডাক্তার ওপর থেকে উঠে যাচ্ছে বিশ্বাস। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রোগীদের জীবন। গত জুন পর্যন্ত দুই বছরে সারা দেশে ভুল চিকিৎসা ও ভুয়া ডাক্তারের কবলে পড়ে চার শতাধিক রোগীর করুণ মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে রাজধানীর নামিদামি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের ভুলের কারণে ৬৭ জন এবং ঢাকার বাইরে আরও প্রায় ৪০০ রোগী মারা যান।
অন্যদিকে দেশজুড়ে ওষুধ বাণিজ্যেও চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য। ভেজাল ওষুধে সয়লাব বাজার। নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ এবং ওষুধ কোম্পানির দৌরাত্ম্যে জিম্মি হয়ে পড়ছেন রোগীরা। রোগীরা জানতেও পারছেন না টাকা দিয়ে আসলে তারা কী কিনছেন?
জবাবদিহিতার চিন্তা মানুষকে সৎ ও নিষ্ঠাবান থাকতে সহায়তা করে। অন্যায়, অপরাধ ও দুর্নীতি থেকে বিরত রাখে। মানুষের মধ্যে যদি এই চিন্তা জাগরুক থাকে যে, কেয়ামতের দিন আমার প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, তাহলে সে স্বেচ্ছায়ই অপরাধ থেকে বিরত থাকবে। অন্যথায় শত আইন করে, নজরদারি করে অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য দেশের মানুষের মধ্যে যদি পরকাল ভাবনা সৃষ্টি হয়, তাকওয়া অর্জন হয় তাহলে প্রাতিটি ক্ষেত্রেই অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সেদিনকে ভয় করো, যেদিন তোমরা আল্লাহর কাছে ফিরে আসবে। অতঃপর প্রত্যেককে তার কর্মফল পুরোপুরি দেওয়া হবে। আর তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৮১)।
পরকালের ভাবনা সৃষ্টি হলে গোটা কোরআন ও ইসলামের হুকুম আহকাম মানা সম্ভব ও সহজ হবে। পবিত্র কোরআনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে বারবার আখেরাত ও কেয়ামত দিবসের জবাবদিহিতা ও হিসাব-নিকাশ ইত্যাদির আলোচনা এসেছে। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো চিকিৎসক, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও কর্তা ব্যক্তিদের মধ্যেও যদি পরকাল ভাবনা সৃষ্টি হয় তাহলে নৈরাজ্য ও দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু বা অঙ্গহানি হলে দোষী ডাক্তারদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট আইন দেশে নেই। কিন্তু ইসলামে এর স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ইচ্ছাকৃত হত্যা বা ভুলবশত হত্যা উভয়ের দ-বিধি পবিত্র কোরআনে রয়েছে। এরশাদ হয়েছে, ‘কোনো মোমিনকে হত্যা করা কোনো মোমিনের কাজ নয়। তবে ভুলবশত হলে তা স্বতন্ত্র এবং কেউ কোনো মোমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে একজন মোমিন দাসমুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে দিয়াত অর্পণ করা বিধেয়। যদি না তারা ক্ষমা করে।’ (সূরা নিসা : ৯২)।
এ আয়াতে দিয়াত বা রক্তপণ হচ্ছে, প্রায় ১৯ ভরি স্বর্ণ বা ২ হাজার ৬২৫ ভরি রুপা কিংবা ১০০ উট (নির্দিষ্ট বয়সের)। এটা হচ্ছে পূর্ণ দিয়াত, যা নিহত ব্যক্তি পুরুষ হলে ওয়াজিব হয়। আর নারীর দিয়াত সর্বক্ষেত্রে পুরুষের অর্ধেক। (হেদায়া : ৪/৬৫৫)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে চিকিৎসক হিসেবে সুপরিচিত নয় এমন কেউ যদি চিকিৎসা করে রোগীর ক্ষতি করে ফেলে, তাহলে তার ওপর জরিমানা আরোপ হবে।’ হাদিসের বর্ণনাকারী আবদুল আজিজ বলেন, ‘এটা শুধু ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে নয়; বরং শল্য চিকিৎসার ক্ষেত্রেও।’ (আবু দাউদ : ৩৩০)।
হাদিসের অর্থ হচ্ছে, চিকিৎসক যদি কোনো অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে রোগীর ক্ষতি করে ফেলেন, তাহলে তাকে জরিমানা দিতে হবে।
মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.) আহসানুল ফাতাওয়ায় বিষয়টির বিষদ বিশ্লেষণ এভাবে করেছেন যে, ডাক্তার দু-ধরনের। এক. বিজ্ঞ ডাক্তার। দুই. অনভিজ্ঞ ডাক্তার। কোনো বিজ্ঞ ডাক্তার যদি রোগীর সম্মতিতে চিকিৎসার সব নিয়ম মেনে চিকিৎসা করেন, অস্ত্রোপচার করেন তদুপরি দুর্ঘটনাক্রমে রোগীর মৃত্যু, অঙ্গহানি বা অন্য কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে তাতে ডাক্তার দায়ী হবেন না। তার ওপর কোনো জরিমানা বর্তাবে না। বিজ্ঞ ডাক্তার যদি রোগীর অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার করেন এবং চিকিৎসা শাস্ত্রীয় নিয়ম-নীতিবহির্ভূত হয় আর তাতে রোগী মারা যান তাহলে চিকিৎসকের ওপর দিয়াত (রক্তপণ) আরোপিত হবে। কোনো অঙ্গহানি হলে শরিয়তের নির্ধারিত জরিমানা (অঙ্গের পণ) বর্তাবে।
অনভিজ্ঞ হাতুড়ে ডাক্তারের সঠিক বা ভুল চিকিৎসায় যে কোনোভাবেই রোগীর মৃত্যু হলে ডাক্তারে ওপর পূর্ণ দিয়াত (রক্তপণ) বর্তাবে। অঙ্গহানি হলে অঙ্গের পূর্ণ জরিমানা বর্তাবে। ডাক্তার যদি নিজ হাতে অস্ত্রোপচার করেন, ইনজেকশন বা স্যালাইন পুশ করেন কিংবা ওষুধ নিজ হাতে খাইয়ে দেন তাহলে সে ক্ষেত্রেই শুধু উপরোক্ত বিধান প্রযোজ্য। চিকিৎসক যদি শুধু ওষুধ লিখে দেন বা প্রেসক্রিপশন দেন এর বেশি কিছু না করেন আর ওষুধ সেবন করে রোগীর ক্ষতি হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে উপরোক্ত বিধান প্রযোজ্য নয়। তবে বিচারক সে ক্ষেত্রে চিকিৎসককে কোনো যৌক্তিক শাস্তি দিতে পারেন। (ফাতাওয়া শামি : ৯/২১৪; ফাতাওয়া আলমগিরি : ৫/৫৬)।
চিকিৎসকের ভুলের কারণে রোগীর মৃত্যু ও অঙ্গহানির ঘটনা যে হারে বাড়ছেÑ তা উদ্বেগজনক। অতিসত্বর এর একটা বিহিত না করলে মানুষ চিকিৎসকদের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে ফেলবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2018 Bauphalnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com